ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষিকাজ কিংবা গবাদিপশু পালনের মাধ্যমে নিজেকে স্বাবলম্বী করতে চাইছেন? আর্থিক সহায়তার জন্য বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষের কাছে একটি অত্যন্ত বিশ্বস্ত নাম হলো কারিতাস।
১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত কারিতাস বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে দেশের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করছে। বিশেষ করে তাদের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম গ্রাম ও শহরের খেটে খাওয়া মানুষের কাছে বেশ পরিচিত।
আজকের এই আর্টিকেলে আমরা কারিতাস এনজিও লোন পাওয়ার পদ্ধতি, আবেদন করার নিয়ম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং এর শর্তাবলি সম্পর্কে বিস্তারিত জানাবো। সঠিক তথ্য জেনে আবেদন করলে আপনার লোন পাওয়ার প্রক্রিয়াটি অনেক সহজ হবে।
Table of Contents
কারিতাস এনজিও লোন কী?
কারিতাস মূলত একটি সমাজকল্যাণ ও উন্নয়নমূলক সংস্থা। দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী, কৃষক, নারী ও ছোট ব্যবসায়ীদের আর্থিকভাবে সাবলীল করার উদ্দেশ্যে তারা যে ঋণ সুবিধা প্রদান করে, সেটিই কারিতাস এনজিও লোন হিসেবে পরিচিত।
পিকেএসএফ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মকানুন মেনে কারিতাস দেশের বিভিন্ন জেলায় এই কার্যক্রম পরিচালনা করে। পিছিয়ে পড়া মানুষের ক্ষমতায়ন এবং দারিদ্র্য দূরীকরণই তাদের মূল উদ্দেশ্য।
কারিতাস থেকে কত টাকা ঋণ পাওয়া যায়?
লোন নেওয়ার উদ্দেশ্য এবং কিস্তি পরিশোধের সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে ঋণের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। সাধারণত নিচের ক্যাটাগরিগুলোতে লোন প্রদান করা হয়:
- প্রাথমিক বা ক্ষুদ্র ঋণ: ব্যক্তিগত কাজ বা ছোট উদ্যোগের জন্য সাধারণত ১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রাথমিক লোন দেওয়া হয়।
- মাঝারি বা মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ ঋণ: ব্যবসা সম্প্রসারণ বা মাঝারি আকারের খামার করার জন্য ৫০ হাজার থেকে শুরু করে কয়েক লক্ষ টাকা পর্যন্ত লোন পাওয়া সম্ভব।
- কৃষি ও খামার ঋণ: কৃষিকাজ, হাঁস-মুরগি বা গবাদিপশু পালনের জন্য সহজ শর্তে এই বিশেষ লোন দেওয়া হয়।
লোন পাওয়ার প্রধান শর্তাবলি
যেকোনো প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়ার আগে তাদের নিয়মকানুন জেনে নেওয়া জরুরি। কারিতাস থেকে লোন নেওয়ার সাধারণ শর্তগুলো হলো:
- আবেদনকারীর বয়স সাধারণত ১৮ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে হতে হবে।
- লোন নেওয়ার আগে আপনাকে অবশ্যই নিকটস্থ কারিতাস শাখার তালিকাভুক্ত সদস্য হতে হবে।
- সমিতির নিয়মানুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিয়মিত সঞ্চয় জমা দিতে হবে।
- আপনি যে শাখা থেকে আবেদন করবেন, আপনাকে ওই এলাকার স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদী বাসিন্দা হতে হবে।
- ক্ষুদ্রঋণের ক্ষেত্রে একটি দল বা গ্রুপের সদস্য হতে হয় এবং গ্রুপের অন্যদের সম্মতি থাকতে হয়।
- লোন নিয়ে আপনি কী করবেন, তার একটি বাস্তবসম্মত ও সঠিক পরিকল্পনা থাকতে হবে।
লোন আবেদনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
আবেদন করার সময় কিছু সাধারণ কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে হয়। লোন অনুমোদনের জন্য নিচের ডকুমেন্টসগুলো সাথে রাখুন:
- আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধনের ফটোকপি।
- আবেদনকারীর সদ্য তোলা পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি।
- নমিনির জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি এবং পাসপোর্ট সাইজের ছবি।
- বর্তমান ঠিকানা প্রমাণের জন্য বিদ্যুৎ বা পানির বিলের কপি।
- ব্যবসার জন্য লোন নিতে চাইলে হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্সের ফটোকপি।
লোন আবেদন করার নিয়ম
সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে কারিতাস তাদের ঋণ প্রদান প্রক্রিয়াটি বেশ সহজ রেখেছে। লোন পেতে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করতে হবে:
ধাপ ১: নিকটস্থ শাখায় যোগাযোগ
প্রথমে আপনার এলাকার কারিতাস অফিসে যেতে হবে। সেখানে দায়িত্বরত কর্মকর্তার সাথে আপনার লোনের উদ্দেশ্য এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করুন।
ধাপ ২: সদস্যপদ ও সঞ্চয় শুরু
অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী আপনাকে একটি গ্রুপের সদস্য করা হবে। এরপর আপনাকে একটি সঞ্চয় বই দেওয়া হবে, যেখানে নিয়ম অনুযায়ী সাপ্তাহিক বা মাসিক ভিত্তিতে সঞ্চয় জমা করতে হবে।
ধাপ ৩: আবেদন ফর্ম পূরণ
সঞ্চয়ের নির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পর আপনি লোনের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। তখন অফিস থেকে দেওয়া নির্ধারিত ফর্মটি সঠিকভাবে পূরণ করে জমা দিন। ফর্মে ঋণের পরিমাণ এবং উদ্দেশ্য পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করতে হবে।
ধাপ ৪: মাঠকর্মীর পরিদর্শন
ফর্ম জমা দেওয়ার পর কারিতাসের একজন কর্মকর্তা আপনার বাড়ি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে আসবেন। তারা মূলত আপনার কাজের জায়গা এবং তথ্যের সত্যতা যাচাই করবেন।
ধাপ ৫: ঋণ অনুমোদন
যাচাই-বাছাই শেষে সবকিছু সঠিক থাকলে শাখা ব্যবস্থাপক আপনার লোন অনুমোদন করবেন। এরপর একটি নির্দিষ্ট তারিখে অফিস থেকে আপনাকে ঋণের টাকা প্রদান করা হবে।
কারিতাস এনজিওর সুবিধা
- তাদের কিস্তির মেয়াদ বেশ সুবিধাজনক। সাপ্তাহিক বা মাসিক কিস্তিতে টাকা শোধ করার সুযোগ রয়েছে।
- লোন পদ্ধতিতে কোনো লুকানো চার্জ নেই এবং নিয়মাবলি অত্যন্ত স্বচ্ছ।
- শুধু লোন প্রদানই নয়, বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে তারা সদস্যদের প্রয়োজনীয় কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
কারিতাস থেকে লোন পেতে কতদিন সময় লাগে?
নতুন সদস্যদের ক্ষেত্রে সঞ্চয় শুরু করার পর প্রথমবার লোন পেতে সাধারণত ৩ থেকে ৪ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। তবে পুরোনো সদস্যরা আবেদন করার ১-২ সপ্তাহের মধ্যেই ঋণ পেয়ে থাকেন।
মহিলাদের জন্য কি বিশেষ কোনো সুবিধা আছে?
কারিতাস নারী ক্ষমতায়নে প্রচুর কাজ করে। সেলাই মেশিন কেনা, হাঁস-মুরগি পালন বা কুটির শিল্পের মতো কাজের জন্য নারীরা খুব সহজেই ঋণ পেয়ে থাকেন।
ব্যবসার অভিজ্ঞতা না থাকলে কি লোন পাওয়া যাবে?
নতুন কোনো উদ্যোগের ক্ষেত্রে মাঠকর্মীকে আপনার সঠিক পরিকল্পনা বোঝাতে পারলে লোন পাওয়া সম্ভব। কারিতাস অনেক সময় বিভিন্ন আয়বর্ধক কাজের ওপর প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকে।
লোনের কিস্তি কীভাবে পরিশোধ করতে হয়?
আপনার সুবিধামতো সাপ্তাহিক বা মাসিক কিস্তিতে টাকা শোধ করার সুযোগ রয়েছে। নির্ধারিত দিন অনুযায়ী সমিতির মিটিংয়ে বা সরাসরি অফিসে গিয়ে টাকা জমা দেওয়া যায়।
শেষ কথা
দেশের প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কারিতাস এনজিওর ভূমিকা অপরিসীম। আপনি যদি সঠিক উপায়ে এবং নিয়ম মেনে আবেদন করেন, তবে কারিতাস থেকে আর্থিক সহায়তা পাওয়া বেশ সহজ। ঋণ নিয়ে সঠিক কাজে বিনিয়োগ করুন এবং নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করে নিজের আর্থিক অবস্থাকে আরও উন্নত করুন।





