বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভাগ্য উন্নয়নে যে কয়টি বিশেষায়িত ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, তার মধ্যে আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক অন্যতম। এই ব্যাংকটি মূলত বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের জন্য তৈরি হলেও, এটি এখন দেশের আবালবৃদ্ধবণিতার আত্মকর্মসংস্থানের এক নির্ভরযোগ্য নাম। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি আনতে এই ব্যাংকের ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্পগুলো অতুলনীয়।
অনেকেই মনে করেন এই ব্যাংক থেকে লোন নেওয়া কেবল আনসার সদস্যদের জন্যই সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে সাধারণ উদ্যোক্তারাও সঠিক নিয়ম মেনে এখান থেকে ঋণ সুবিধা ভোগ করতে পারেন। আজকের এই ব্লগে আমরা আলোচনা করব আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক লোন পাওয়ার উপায়, আবেদনের ধাপসমূহ এবং প্রয়োজনীয় তথ্যাবলি।
আপনি যদি নিজের কোনো ছোট উদ্যোগকে বড় করতে চান বা বেকারত্ব দূর করে স্বাবলম্বী হতে চান, তবে এই ব্যাংকটি আপনার জন্য সেরা পছন্দ হতে পারে। অত্যন্ত সহজ শর্তে এবং স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে এই ব্যাংকের কোনো বিকল্প নেই বললেই চলে। চলুন তবে বিস্তারিত শুরু করা যাক।
Table of Contents
আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক লোন কী?
আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক লোন হলো মূলত একটি বিশেষায়িত সরকারি ঋণ ব্যবস্থা। এটি ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই গ্রাম ও মফস্বলের দরিদ্র ও সাধারণ আয়ের মানুষদের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। এই ব্যাংকের ঋণের প্রধান লক্ষ্য হলো উৎপাদনশীল খাতে অর্থ জোগান দেওয়া।
এই লোন মূলত দলভিত্তিক বা ব্যক্তিগতভাবে প্রদান করা হয়। ব্যাংকটি তার গ্রাহকদের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা, মৎস্য চাষ, হাঁস-মুরগি পালন এবং কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধন সরবরাহ করে থাকে। এই ব্যাংকের ঋণের একটি বিশেষ দিক হলো এটি কেবল টাকা দেয় না, বরং ঋণের সঠিক ব্যবহারের ওপর জোর দেয়।
আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের মূল স্লোগান হলো ‘উন্নয়নের অংশীদার’। অর্থাৎ, তারা কেবল মহাজন হিসেবে টাকা ধার দেয় না, বরং গ্রাহকের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। সঠিক নিয়ম জানলে আপনি খুব সহজেই এই ব্যাংকের একজন ঋণগ্রহীতা হতে পারেন।
আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক লোনের বিভিন্ন স্কিম
এই ব্যাংকে বিভিন্ন ধরনের লোন বা ঋণ স্কিম রয়েছে। আবেদন করার আগে আপনাকে জানতে হবে আপনি কোন স্কিমের আওতায় লোন নিতে চান। প্রধান কিছু স্কিম নিচে আলোচনা করা হলো:
১. সাধারণ ঋণ (General Loan)
এটি মূলত আনসার ও ভিডিপি বাহিনীর সদস্যদের জন্য। বাহিনীর সদস্যরা তাদের জরুরি প্রয়োজনে এই লোন নিতে পারেন। এর প্রসেসিং খুব দ্রুত হয় এবং সুদের হারও সাধারণ মানুষের তুলনায় অনেক কম থাকে।
২. ক্ষুদ্র ঋণ (Micro Credit)
গ্রামীণ মহিলাদের স্বাবলম্বী করতে এবং ছোট ছোট কুটির শিল্প স্থাপনে এই লোন দেওয়া হয়। সাধারণত দলগতভাবে এই ঋণ বিতরণ করা হয়। ৫ থেকে ১০ জনের একটি দল গঠন করে এই ঋণের জন্য আবেদন করা সম্ভব।
৩. কৃষি ও পল্লী ঋণ
যারা মৎস্য চাষ, গবাদি পশু পালন বা বিভিন্ন মৌসুমি ফসল চাষ করতে চান, তাদের জন্য এই লোন দেওয়া হয়। বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে যারা অবদান রাখছেন, তাদের জন্য এটি একটি বড় সুযোগ। স্বল্প সুদে এবং সহজ কিস্তিতে এই ঋণ পাওয়া যায়।
৪. এসএমই বা উদ্যোক্তা ঋণ
নতুন কোনো ব্যবসা শুরু করতে বা বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য বড় অংকের অর্থের প্রয়োজন হলে এই লোন নেওয়া যায়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য এই লোনটি অত্যন্ত জনপ্রিয়। এক্ষেত্রে ব্যবসার বৈধতা ও আয়ের সম্ভাবনা যাচাই করা হয়।
আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক লোন পেতে কি কি লাগে?
যেকোনো লোন বা ঋণের জন্য ডকুমেন্টেশন বা কাগজপত্র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আনসার ভিডিপি ব্যাংক সরকারি ব্যাংক হওয়ায় এখানে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়। লোন পেতে হলে আপনাকে নিচের কাগজপত্রগুলো প্রস্তুত রাখতে হবে:
ব্যক্তিগত কাগজপত্র:
- আবেদনকারীর ৩ থেকে ৪ কপি সাম্প্রতিক তোলা পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি।
- আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র (NID কার্ড) অথবা জন্ম নিবন্ধন সনদের সত্যায়িত ফটোকপি।
- আনসার বা ভিডিপি সদস্য হলে তার সদস্য সনদপত্র বা সদস্য নম্বর (ID Card Copy)।
- বর্তমান ঠিকানা এবং স্থায়ী ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে ইউটিলিটি বিলের কপি।
আয় ও পেশার প্রমাণপত্র:
- সদস্য বই বা পাস বই (যদি আপনি ওই ব্যাংকের একজন শেয়ারহোল্ডার বা সদস্য হয়ে থাকেন)।
- ব্যবসার ক্ষেত্রে ট্রেড লাইসেন্স এবং আয়ের বিস্তারিত বিবরণ।
- চাকরিজীবী হলে অফিস থেকে ইস্যু করা আয়ের সনদ বা পে-স্লিপ।
জামিনদার বা গ্যারান্টার সংক্রান্ত তথ্য:
- সাধারণত দুজন বিশ্বস্ত জামিনদারের ছবি এবং তাদের এনআইডি কার্ডের কপি।
- জামিনদারদের মধ্যে একজন অন্তত আবেদনকারীর কর্মস্থল বা এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তি হওয়া ভালো।
- লোন অংক বড় হলে গ্যারান্টার হিসেবে চাকরিজীবী বা সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত কারো প্রয়োজন হতে পারে।
অন্যান্য ডকুমেন্ট:
- ব্যাংকের সেভিংস অ্যাকাউন্টের চেক বই বা পাস বই।
- যদি লোনটি কোনো জামানতের বিপরীতে হয় (যেমন জমি বা ডিপিএস), তবে সেই দলিলের মূল কপি বা ফটোকপি।
আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক লোন ইন্টারেস্ট রেট
সুদের হার বা ইন্টারেস্ট রেট লোন নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি বড় প্রভাব বিস্তার করে। আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের সুদের হার অন্যান্য বেসরকারি ব্যাংকের তুলনায় অনেক কম এবং সহনীয়। বর্তমানে সরকারি নির্দেশনা ও ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী এটি নির্ধারিত হয়।
সাধারণত আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের জন্য সুদের হার ৮% থেকে ১০% এর মধ্যে উঠানামা করে। তবে কৃষি ঋণ বা বিশেষ কোনো সরকারি প্রকল্পের আওতায় এটি ৫% থেকে ৭% পর্যন্তও নামতে পারে। সাধারণ নাগরিকদের ক্ষেত্রে এই হার কিছুটা বেশি হতে পারে, যা সাধারণত ১০% থেকে ১২% এর আশেপাশে থাকে।
সুদের হিসাবটি করা হয় সাধারণত রিডিউসিং ব্যালেন্স মেথডে। অর্থাৎ, আপনি যত কিস্তি দেবেন, আপনার আসলের ওপর সুদের হার তত কমতে থাকবে। এটি গ্রাহকদের জন্য বেশ লাভজনক একটি পদ্ধতি। লোন নেওয়ার আগে বর্তমান সুদের হার আপনার স্থানীয় ব্রাঞ্চ থেকে কনফার্ম করে নিন।
লোন আবেদন করার নিয়ম: ধাপে ধাপে বিস্তারিত
আপনি যদি মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকেন এবং সব কাগজপত্র ঠিক থাকে, তবে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করে লোন আবেদন করতে পারেন:
ধাপ ১: মেম্বারশিপ বা সদস্য পদ নিশ্চিত করা
আনসার ভিডিপি ব্যাংকের লোন পেতে হলে আপনাকে ওই ব্যাংকের একজন মেম্বার বা শেয়ারহোল্ডার হওয়া প্রয়োজন। এজন্য আপনাকে অন্তত একটি শেয়ার কিনতে হবে। মেম্বার হওয়ার পর আপনাকে একটি পাসবই দেওয়া হবে, যা লোন পাওয়ার প্রধান শর্ত।
ধাপ ২: সঠিক লোন নির্বাচন ও আবেদন ফরম সংগ্রহ
আপনার নিকটস্থ আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক শাখায় যান। লোন অফিসারের সাথে কথা বলুন এবং আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী লোনের ধরন বেছে নিন। এরপর একটি নির্দিষ্ট লোন আবেদন ফরম সংগ্রহ করুন।
ধাপ ৩: ফরম পূরণ ও ডকুমেন্টেশন
আবেদন ফরমটি নির্ভুলভাবে পূরণ করুন। খেয়াল রাখবেন যেন আপনার স্বাক্ষর এবং তথ্যে কোনো গরমিল না থাকে। এরপর প্রয়োজনীয় সব সত্যায়িত কাগজপত্র ফরমের সাথে সংযুক্ত করুন। আপনার জামিনদারদের স্বাক্ষরও ফরমের নির্দিষ্ট স্থানে নিন।
ধাপ ৪: আবেদন জমা ও যাচাই (Verification)
পূরণকৃত ফরমটি ব্যাংকে জমা দেওয়ার পর ব্যাংক কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত করবে। আপনার এলাকা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের ফিল্ড অফিসাররা পরিদর্শন করতে পারেন। আপনার আয়ের সক্ষমতা এবং সততা যাচাই করাই তাদের মূল উদ্দেশ্য।
ধাপ ৫: লোন অনুমোদন ও চেক প্রদান
ভেরিফিকেশন রিপোর্ট পজিটিভ হলে আপনার লোনটি অনুমোদিত হবে। অনুমোদনের পর আপনাকে ব্যাংকে ডেকে নিয়ে কিছু আইনি দলিলে স্বাক্ষর নেওয়া হবে। সবশেষে আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লোনের টাকা জমা দেওয়া হবে অথবা সরাসরি চেক প্রদান করা হবে।
লোন পাওয়ার যোগ্যতা ও শর্তাবলি
সবার আগে আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে যে আপনি ব্যাংকের লোন পাওয়ার জন্য যোগ্য কি না। সাধারণত এই যোগ্যতাগুলো দেখা হয়:
১. আবেদনকারীকে অবশ্যই বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং তার বয়স নূন্যতম ১৮ বছর হতে হবে।
২. তাকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের একজন শেয়ারহোল্ডার বা সদস্য হতে হবে।
৩. আবেদনকারীর কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণখেলাপির রেকর্ড থাকা যাবে না।
৪. শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ এবং টাকা পরিশোধের সক্ষমতা থাকতে হবে।
৫. সাধারণত আনসার বা ভিডিপি সদস্যদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, তবে অ-সদস্যরাও বিশেষ প্রকল্পের আওতায় আবেদন করতে পারেন।
লোন পরিশোধের নিয়ম ও সুবিধা
আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের অন্যতম বড় সুবিধা হলো তাদের সহজ কিস্তি পদ্ধতি। আপনি আপনার আয়ের উৎসের ওপর ভিত্তি করে মাসিক বা ত্রৈমাসিক কিস্তি নির্ধারণ করতে পারেন। কৃষি ঋণের ক্ষেত্রে ফসল কাটার পর এককালীন টাকা শোধ করার সুযোগও থাকে।
ব্যাংকটি গ্রাহকদের কিস্তি পরিশোধে উৎসাহ দেয়। আপনি যদি সময়মতো সব কিস্তি শোধ করেন, তবে পরবর্তী সময়ে আরও বড় অংকের লোন পাওয়ার পথ সহজ হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে ভালো গ্রাহকদের জন্য সুদের হারে কিছু ছাড় দেওয়ারও নজির রয়েছে এই ব্যাংকে।
যদি কোনো বিশেষ কারণে আপনি কিস্তি দিতে দেরি করেন, তবে ব্যাংককে আগেভাগে জানানো উচিত। এতে করে জরিমানার পরিমাণ কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে সবসময় চেষ্টা করবেন ব্যাংক লেনদেন স্বচ্ছ রাখতে, যাতে ভবিষ্যতে লোন পেতে অসুবিধা না হয়।
উপসংহার
আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক মূলত সাধারণ মানুষের স্বপ্নের ব্যাংক। আপনি যদি বড় কোনো করপোরেট ব্যাংকের জটিলতা এড়াতে চান এবং সহজ নিয়মে লোন পেতে চান, তবে এটিই আপনার জন্য আদর্শ স্থান। তাদের নিয়মগুলো স্বচ্ছ এবং গ্রামীণ মানুষের জন্য অত্যন্ত সহায়ক।
এই ব্লগ পোস্টে আমরা আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক লোন পাওয়ার উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। আশা করি, এই তথ্যগুলো আপনার স্বপ্ন বাস্তবায়নে সহায়ক হবে। মনে রাখবেন, লোন নেওয়া কোনো বড় বিষয় নয়, বরং লোনের সঠিক ব্যবহার ও সময়মতো পরিশোধই হলো আসল সফলতা।
লোন সংক্রান্ত আরও বিস্তারিত জানতে আপনি সরাসরি ব্যাংকের হটলাইন নম্বরে কল করতে পারেন অথবা নিকটস্থ শাখা পরিদর্শন করতে পারেন। আপনার ব্যবসায়িক যাত্রায় আনসার ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক হোক আপনার ছায়াসঙ্গী।





